আজঃ ২রা ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ - ১৭ই আগস্ট, ২০১৯ ইং - রাত ৮:৩৫

মুক্তিযুদ্ধের গল্প, “”যুদ্ধ””

Published: ডিসে ১৬, ২০১৮ - ১০:৩২ অপরাহ্ণ

খুব কাতরাচ্ছে আব্বাস আলী। মাগো আর বাবাগোয় গমগম করছে তার চারপাশ।

একটু পরপরই বলছে ‘ছেদু, ভাই আমার, বাচা আমারে। ভাইরে আমি মরে গেলাম। আমারে বাচা।’

অবাক লাগছে ছেদুর। গেল বিস্যুদবারেও অন্যরূপ দেখেছে ওদের। আব্বাস করিমদ্দি আর আজম আলি। লাফাচ্ছিল বেশি আব্বাসই। আর লাফাচ্ছিল তার হাতের মশাল। তিড়িং বিড়িং করে মশালটা এগিয়ে যাচ্ছিল এঘর থেকে সেঘর। তার আগুনচুমোয় জ্বলে উঠছিল প্রতিটা চাল। খড়ের। গোলপাতার। তালপাতার। সেই লকলকে আলোয় আব্বাসের ফর্সা মুখের উপর চিকচিক করছিল তৃপ্তির ঘাম। চোখদুটোয় ঝিলিক দিচ্ছিল পাশবিক শান্তি।

মনে আছে ছেদুর।

তার ‘আল্লা হকবার আল্লা হকবার’ কানে বাজছে এখনো।

মেয়েদের দায়িত্ব ছিল করিমদ্দি আর আজম আলীর উপর। ধরে বেধে তাদের জিপগাড়িতে তুলল তারা। সব ক’জনের আহাজারি শুনতে পাচ্ছে ছেদু। এখনো।

রামপুর স্কুলে ক্যাম্প হয়েছে। গ্রামে গ্রামে শান্তি কমিটি গজিয়ে উঠছে, এও জানা খবর। এগ্রাম সেগ্রাম মানুষ মেরে বেড়াচ্ছে। লুটতরাজ চলছে। চুরি চামারি শেষে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে বাড়িগুলোয়। কিন্তু এতদূরের পথ পাড়ি দিয়ে এই অচ্ছুত অপবিত্র বাগদিপাড়ায় মিলিটারি আসবে এটা ভাবেনি কেউ। তবু, সাবধানের মার নেই। প্রথম যেদিন খবরটা শুনেছিল, পালিয়েছিল যে যেদিকে পারে। কিন্তু তারা আসেনি সেদিন, এসেছিল রাজাকারের বাচ্চারা। ফাঁকা ঘরবাড়ি ফাঁকা করে দিয়েছিল। সেদিন যেটুকু বাকি ছিল, সেটুকু নিয়েছিল আরেকদিন। সেদিনও ‘মিলিটারি আসচে মিলিটারি আসচে’ রব উঠেছিল। ছেদুরা পালিয়েছিল।

কিন্তু যেদিন সত্যিই আসলো যমদূতেরা, সেদিন কোনো আওয়াজ হয়নি। অপ্রস্তুত অবস্থায়ই ধরা পড়েছে পুরো পাড়া। আর জ্বলে উঠেছে নিরীহ শুকনো বাঁশপাতার মতো। কিংবা সোনালী ফেশো জড়ানো সাদা লিকলিকে পাটকাঠির মতো।

ঘরের পেছনে বাঁশবাগান। তার পেছনে মানকচুর ক্ষেত। ওই ক্ষেতে কাজ করছিল ছেদু।

তখন বিকেল। খুব চাপ ধরেছিল। গাঁট থেকে পাতার বিড়ির পাছাটা বের হয়ে এসেছিল হাতে। ধরিয়ে নিয়ে গিয়ে বসেছিল বাগানে। দূর থেকে বাগানটাকে অভেদ্য মনে হয়। কাছে যেতে থাকলেই হালকা হতে থাকে গাছড়ার ভীড়। ফাঁকা ফাঁকা লাগে। ফলে আড়াল পাওয়া দায়। চোখবুজেই তাই আড়াল আনে পাড়ার লোকেরা। যে দেখে দেখুক, তাকে নিজে না দেখলেই হলো! ওখানে গিয়েই সেদিন বেঁচে গিয়েছিল ও। এবং আরও কয়েকজন, যারা পালাতে পেরেছিল। লুকিয়েছিল ওই বাগানে। কচুক্ষেতে। বা তারও পেছনের পাটবনে। তবে বাঁশবাগানে ছেদুর সাথে যারা ছিল, সবাই দেখেছে কী লীলা ওইদিন চালিয়েছে পাষ-রা।

এলোপাতাড়ি যে লাশগুলো নকশা কেটেছিল বাগদিপাড়ার ছ্যাদলাপড়া কালচে মাটির বুকে, তার মধ্যে খেদিও ছিল। আধো বোলের বয়স পেরিয়েছে কেবল। মুখটা ভরে ওঠেনি দাঁতে। উঠোনে বসে মেয়েটার মাথায় তেল দিচ্ছিল খগেন। খেদির হালকা লাল যখন খগেনের ঘন কালচের সাথে মিলে যাচ্ছিল, দূর থেকেও ছেদু বুঝেছিল ও রক্ত মিশছে না একটায় আরেকটা। মেশার কথা না। জল যেমন জল চেনে, রক্তও তো তেমন। একের সাথে আর মেশে না। খেদির মার কথা মনে পড়ছিল। মরার আগে কাউকে বলে যায়নি সে, কেউ তাই জানে না কিছু।

ছেদুর বুকে তখন কেমন কেমন ভীষণ একটা যন্ত্রণা। যেন রসের হাঁড়ি থেকে টগবগে ফুটন্ত নলুনে গুড় নিয়ে কেউ ঢেলে দিয়েছে গলায়। কিংবা দেড়শ’টা বোলতা হুল ফুটিয়েছে একসাথে। কিংবা শিংমাছের ডেরায় হাত পড়েছিল, কাঁটা মেরেছে দলবেঁধে।

লাশগুলোর উপর দিয়ে এক্কাদোক্কা খেলার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে জিপে উঠেছিল আব্বাসরা। ওর সেদিনের কাণ্ডের সাথে আজকের এই গোঙানিটাকে মেলানো যাচ্ছে না। ঘর জ্বালাতে জ্বালাতে যে লোক মুখে ফেনা তুলে ফেলছিল আল্লা আল্লা করে, আজ সে একবারও আল্লাকে ডাকেনি। অন্তত শোনেনি ছেদু। একবারও শুয়োরমুখো মালাউন গুখেকো বা হিঁদুর বাচ্চা বলে গাল দেয়নি ওকে। বরং এমনভাবে ভাই ভাই করছে, আব্বাসের মা থাকলে স্বীকার করতে বাধ্য হতো, ছেদু তার হারিয়ে যাওয়া ছেলে।

সাপে কেটেছে আব্বাস মিয়াকে। চিকিৎসা করাতে হবে। ঘণ্টাখানেক হয়েছে ছেদুকে ধরে এনেছে শান্তিকমিটির চেলারা।

ও চিকিৎসক না। ওঁঝাও না। তবে দারুণ একটা ক্ষমতা আছে ওর। এমন কোনো সাপ নেই যা ও ধরতে পারে না। সাপ ধরা আর পোষা ওর শখ। একার সংসার। দুবেলা দুমুঠো হলেই হয়। সপ্তায় দুসপ্তায় এক দুটো জোন দেয়। একটু আধটু মাছ টাছ ধরে। আর ওই সাপ বিক্রি। সব মিলে খারাপ চলে না।

ওর কাছে সাপ কিনতেন নাগরাজ ওঝা। এ অঞ্চলে বিখ্যাত। ওঁ-ই বলেছিলেন, সাপের ওপর এত দখল ছেদুর, ওঝাগিরিটা একটু শিখে নিলে সাতুপুরুষের আর কষ্ট করা লাগবে না। তা হলে তো ভালোই হয়। ও তাই শিষ্যত্ব নিয়েছিল নাগরাজের। কিন্তু বছর দুয়েক পরেই তাড়িয়ে দিয়েছিলেন গুরুজি ওকে।

শেখা তাই হলো না আর।

তবে মানুষের মুখ বড় আজব যন্ত্র, যা বের করে, তা-ই বিশ্বাস করে অন্যরা। চা’র দোকানে কে যেন একদিন বলল, সকল বিদ্যা ছেদুর জিম্মায় রেখে নাগরাজ গেছে কামরূপ কামাখ্যা, নতুন তন্ত্রের সন্ধানে। রাষ্ট্র হয়ে গেল কথাটা। তারপর থেকেই তার এই নামডাক। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তার হাতে একটা রোগীও মরেনি এখনো। সবই যে মা মনসার কৃপা তা ছেদু ছাড়া আর যে জানত তারও খোঁজ নেই। ফলে লোক তাকে সিদ্ধপুরুষ বলেই মানে।

প্রথম রোজার দিন আজ। ছেহরি খেয়ে নামাজ পড়েছে আব্বাস। নামাজ পড়েই ঘুমোনো অভ্যাস তার। ঘুমোতেই যাচ্ছিল। তার আগে গিয়েছিল গরম পানি ছাড়তে।

রান্নাঘরের পিছনে বাগান। বাগানে তখন ঝিরিঝিরি বাতাস। পাতায় পাতায় সতর্কতা। ফিসফিসানি। আর চাপা আতঙ্ক। তবু আলো হয়ে গেছে চারপাশ। কেউ দেখে ফেলে কি না, ভাবতে ভাবতে একটু ভিতরেই ঢুকেছিল। তারপর বসা। তারপর ছেড়ে দেয়া। তারপর আরাম! কিন্তু যেই না বসেছে, অমনি ছোবল। লাগবি না লাগ লেগেছে সেটা অণ্ডকোষে!

‘যেইরাম পাপকাম করে বেড়াচ্চে গত মাসকয় ধরে, এ তারই ফল।’ মনে হচ্ছে আব্বাসের স্ত্রীর। চিবিয়ে চিবিয়ে দুবার সে বলেওছে কথাটা। শোনার পর থেকেই তওবা করছে আব্বাস। সেরে উঠলে আর অমন কিছু করবে না। প্রতিজ্ঞা করছে। কিরে কাটছে আল্লাহর নামে।

ছেদুর অবশ্য তা মনে হচ্ছে না। ‘পাপের শাস্তি হলি ওর জাতসাপই কামড়াত। তালি সাতে সাতেই দফারফা। উটে বাপের নামও নিতি পারত না। এইডা সেরাম কিচু না।’ এক দেখাতেই বুঝেছে এটা ঢোঁড়াসাপের কাজ। একটুখানি আঁচড় লেগে আছে। বিষধর সাপ হলে দেড় আঙুল ফাঁক দিয়ে দুটো খোঁচার চিহ্ন থাকত।

‘ইরাম না হলিই যে সিডা বিষাক্ত সাপ না, সিডাও বোলা যাবে না।’ গুরুজি শেখাচ্ছিলেন একদিন।

‘তালি কিরাম করে বোজবো কোনডা বিষির, কোনডা না?’

রহস্যের হাসি হেসেছিলেন নাগরাজ। ‘সিডাই তো মোজা। কামড়ের জাগাডার রং বইদলি যায়। ধর, কাইলচি হুয়ি গ্যালো, বা নীলি হুয়ি গ্যালো। বা ফুলি গ্যালো জাগাডা। কিংবা ধর ফোস্কা পইড়লো আর কিছুপরে পচন ধুরি গ্যালো।’

মজার ব্যাপার হলো, আব্বাসের নিম্নাঙ্গ এবং আশপাশের জায়গাটা ফুলে গেছে। রংটাও মনে হচ্ছে নীলের কাছাকাছি। তবু ছেদু জানে এটা বিষের কাজ না।

গুরুজির শেখানোর ধরন ছিল অন্য রকম। একটা শিক্ষাও তিনি মাগনা দেবেন না। একটা সাপ, একটা ওষুধ। একটা কাজ, একটা জ্ঞান। শর্তটা মানতেন কপাললেখার মতো। ইয়া বড় একটা গোখরো সাপ ধরে দিলে তবেই পরেরটুকু ছেড়েছিলেন।

‘এসব হলিও নিচ্চিত বোলা যাবে না যে বিষিরই ক্রিয়া’, হাসি মাখিয়ে বলেছিলেন। ‘রঙ বদল তো নানা কারণেই হতি পারে। দংশন হলি পর মানুষ হইন্যি হুয়ি কত কীই না করে! যেমন ধর জাগাডা ছুরিদে কাইটি দেয় মন্দ রক্ত ঝুরি যাবে মনে কুুরি। গিরুর পর গিরু দেয় যাতে বিষডা না ছুড়ায়। কাজের কাজ তাতি তো হয়ই না, উল্টু রক্ত চুলাচল যায় বন্দ হুয়ি। আবার মনে কর কেউ কেউ আছ দুদিনির বৈরিগী ভাতের অন্ন না কলি হজম হয় না, তারা দিকা গেল এসিট টেসিট দে জাগাডা পুড়াই ফেইললো বিষ পুড়ি যাবে মনে কুরি। কিংবা চিকিসসা কত্তি গে গাছড়ার রস মাখাই রাইকলো, তা হলিও বলো ও জাগার রং বইদলি যাবে বা পচন ধরবে! বুজলি কিবা?’

গুরুজির সেই হাসিটাই এখন হাসতে ইচ্ছে করছে ছেদুর। আব্বাস আলির এক সাগরেদ মাতব্বরী করে অ-কোষের গোড়ায় গিঁট দিয়েছে একটা। এমনই কষা গিঁট, বেচারা দম নিতেও পারছে না ঠিকমতো। অথচ বিষক্রিয়া হলে, এই দুই ঘণ্টা হতে চলল, ওর তো চোখে ঝাপসা দেখার কথা। সবকিছু ডাবল দেখার কথা। ঘাড়মাথা অবশ হয়ে পেছনে ঝুলে যাওয়ার কথা। নিদেন পক্ষে মাথা ঘোরানো আর বমি তো হওয়ারই কথা।

এই শিক্ষাটা অবশ্য গুরুজি দেননি।

গুরুপত্নি ওকে খাতির করত খুব। গুরুজি বাড়ি না থাকলে সেটা বেড়ে যেত আরও। একাজ সেকাজ কতকিছু করতে হতো ওকে! গুরুজির মতোই তখন চালাকি করত তখন ও। প্রতিটা কাজের জন্য একটা করে প্রতিদান দিতে হবে। কতকিছু যে এভাবে বাগিয়ে নিয়েছে ছেদু, তা আর না বলে।

গুরুজি যে একটা ভণ্ড তা গুরুপত্নিই বলেছিলেন। বলেছিলেন আরও আরও ওঝাঁ যারা আছেন তাদের প্রায় সবাই অমন। অবাক হয়েছিল ছেদু। মানতে পারেনি কথাটা।

‘ভণ্ড হলি এত এত রুগি সব সারে কিসির জোরে?’

‘শোনো হাঁদারাম, গাঁও গিরামে যিসপ সাপ আছে তার দশডার ধরো সাড়ে নডাই তুমার গুরুর মতো, বুজদি পারিচাও, বিষ নেই শুদু ফনাই সার!’ বলে হেসে উঠেছিল সে। হাসির কোথায় যেন মেঘ ছিল লেপ্টে, বুঝতে অসুবিধা হয়নি।

‘সাপেকাটা রুগি যত আসে তার সবই প্রায় হাওয়ায় হাওয়ায় বাচে। তুমার গুরু শুদু মিচেমিচি ঝাড়ফুঁক তাকতুক করতি থাকে আর এমন ভাব মারে যেন লখিন্দরের বিষও ও-ই ঝাড়াইলো!’ গুরুজির মতো হাসার ভান করে ব্যর্থ হয়েছিল গুরুপত্নি। ছেদুও বিশ্বাস করেনি কথাটা। কিন্তু এই বছর দশেকের ওঁঝাজীবনে নিজেই প্রমাণ পেয়েছে। বাঁচতে মানুষের ওষুধ লাগে না। লাগে বিশ্বাস। আজকের এই আব্বাস রাজাকারও তার চিকিৎসায় বেঁচে যাওয়া রোগির খাতায় নাম লেখাবে। ভাবতেই হাসি পেল।

করুণ স্বরে কঁকাচ্ছে আব্বাস। ‘ভাই তুই আমার ঠিক করে দে, যা চাবি আমি তাই দোবো। আল্লার কিরে।’

এই কথা ব্যাটা আগেও ক’বার বলেছে। চাইলেই যদি পাওয়া যায়, তবে চাইতে হবে ভেবে চিন্তে। চোখ বুজে তা-ই ভাবছে ও। কী দাবি করা যায়। কী চাওয়া যায়। ভাবছে তো ভাবছেই। কিন্তু মাথায় ছাই আসছে না কিছু।

পথের গায়েই রামপুর ইশকুল। আসার সময় তাকাচ্ছিল ভয়ে ভয়ে। বাগদি পাড়ার মেয়েগুলোর একটাকে না একটাকে দেখা যাবে এই ছিল ওর আশা। কিন্তু না, কাউকে দেখা গেল না। অত সকালে অবশ্য ঘুমিয়ে থাকারই কথা সবার। ছেদুও তো ঘুমিয়েই ছিল, না হলে এই সময় কেউ কাওকে ধরে আনতে পারে! অবাক লাগছিল। কী মরাঘুম ঘুমিয়েছে ও, মিলিটারি যদি যেত, জায়গায় মেরে ফেলত না? তখনই চোখ পড়েছিল ইশকুলের সামনের কৃষ্ণচূড়া না সোনালু না কী একটা গাছের তলায়। একটা লায়েক মতো ছেলে বাঁধা তখনো। সারা গায়ে রক্তের দাগ। কত নিরীহ জনের কান্নায় ভিজে যে নোনতা হয়ে উঠেছে ওখানকার মাটি, কতজনের শেষ নিঃশ্বাস যে মিশে আছে গাছগুলোর শুকনো ফাটা চামড়ার ফাঁকে ফাঁকে তার ইয়ত্তা নেই। সব ওই আব্বাস আর আজমের কাজ। শিউরে উঠেছিল গা। কিন্তু কে লোকটা? চেনা যায়নি দূর থেকে। চেনারই বা কী দরকার? যে-ই হোক, মানুষ তো! বাঙালি তো! লোকটাকে ছাড়িয়ে নিতে পারে ছেদু। কিংবা বাগদি পাড়ার মেয়েগুলোনরেও ছাড়ানো যায়। হ্যাঁ এইটা একটা কাজের কাজ হবে। এ ব্যাপারে তাই কথা বলেছে ও আব্বাসের সাথে।

আব্বাস বলেছে কাউকে ছাড়ানোর ক্ষমতা তার নেই। তার শুধু ধরে দেওয়াই কাজ। কাকে মারবে কাকে ছাড়বে আর কাকে নিয়ে ফুর্তি করবে এসব হুজুরদের বিবেচনা। তবে সে অনুরোধ করে দেখবে। ছেদুও কম যায় না। ওর মতো দামদর করতে পারা লোক ওদের সারা বাজারে আর নেই। রোগির পাশ থেকে উঠে যাওয়ার ভান করেছে। ‘তালি আমি যাই। শুদু শুদু সুমায় নষ্ট করব না। অনেক কাজ পড়ে আচে। ক্যাম্পের বাগানে নাকি এ্যাট্টা সাপ পাওয়া গেচে। ধরতি হবে।’ বলেই উঠে দাঁড়িয়েছে। চেলাপেলারা হৈ হৈ করে থামিয়েছে তখন। ইশারায় রাজি হতে বলেছে আব্বাসকে। আব্বাসও রাজি হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকেই মন বদলে গেছে ছেদুর। ওই লোকটা বা মেয়েলোকগুলোকে ছাড়ানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার আছে।

ঠাকুরদা একটা গল্প করত প্রায়ই। ‘কেষ্টপুরির লোকজন চান্দা তুলেচে, যাত্রা দ্যাকপে। যে সে যাত্রা না, যাত্রাদল ভাড়া করে আনা হলো শহরেত্তে। কী যে ভীড় হইল মানুষির সেবার! যেন সব হুমড়ি খেয়ে পড়েচে। পালাডাও মনে কর সেরাম! নায়কার ছিল সাপ পুষার বাতিক। তো পালা চলচে। নায়কা গান করচে। সাপ খেলা দেকাচ্চে। সাপ নিয়ে গায় জড়াচ্চে। চুমু খাচ্চে। নানা কিছিমির কীত্তিকলাপ। সাপটা হটাৎ ছোবল দিল নায়কার বুকি। সে কী ভয়ংকর পরিস্তিতি! লোকজন সব হাঁ হয়ে আচে। একটা ঘাস ভাঙলিও পট করে শব্দ শুনা যাবে এরাম নীরাবতা। মঞ্চের উপর গড়াগড়ি খাচ্চে নায়কা। গড়াগড়ি খাচ্ছে সাপ। আমরা তো মনে করিচি পালারই অংশ। কিন্তু না, একসময় খেয়াল হলো, নায়কা উটে বসেচে, সাপটা নড়ে না আর! চিন্তা করা যায়! নায়কার বুক দংশন করে মরে গেল সাপ, নায়কার কিচুই হলো না!’

সত্যি না মিথ্যে জানার উপায় নেই। ঠাকুরদা বলত খুব রসিয়ে। এমন ভাবে, যেন জীবন্ত দেখতে পেত ছেদু। নায়িকা নাচছে। তার পেছন দুলছে। বুক দুলছে। দুলছে তার হাতে থাকা সাপ। সাপের মুখে চুমু খাচ্ছে নায়িকা। আর সাপটা হঠাৎ হিস করে ছোঁবল দিচ্ছে নায়িকার বুকে। ছবির মতো ভাসে ঘটনাটা।

পোষা নির্বিষ সাপ যেহেতু, নায়কার তো না মরারই কথা, কিন্তু সাপ মরল কেন?

‘কেন আবার! নাইকার গায় নিচ্চয় বিষ ছিল। না হলি আর কি?’

এই ছিল ঠাকুরদার সমস্যা। এমন সব কথা বলত, মনে হতো পাগল প্রলাপ! আচ্ছা, মানুষের গায়ে বিষ থাকে কী করে? তর্ক জুড়েও লাভ হয়নি। নায়কার গায় বিষই ছিল। গোঁ ধরে বলছিল ঠাকুরদা। তবু বিশ্বাস হয়নি ছেদুর। কিন্তু ‘গরিবির কতা বাসি হলি ফলে’। ঠাকুমার কথাটা মনে পড়ছে আজ। আব্বাস রাজাকারকে সেই নায়িকার মতোই বিষধর মনে হচ্ছে ছেদুর।

রোগীকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে উঠোনের মাঝখানে। শীতল পাটির উপর একটা নতুন কাঁথা বিছানো। বালিশ নেই। চেলাপেলারা বলেছিল তেজপাতা গাছের ছায়ায় পাটি পাতার জন্য। না, তা করা যাবে না। টানা রোদে সাপের বিষ নড়তে পারে না। উঠতে পারে না। নামানো সহজ হয়। তাই ভ্যাপসা গরম আর রোদ আর মরণের ভয়ে নেতিয়ে পড়েছে আব্বাস। সারাগায়ে তার গাছড়ার বাড়ি মারছে ছেদু, খিস্তিখেউড় গাইছে, সাপের মা বাপ তুলে গাল দিচ্ছে, আর ভাবছে এসব। ভাবতে ভাবতেই চলে গেল ও গুরুজীর কাছে। গুরুজী তখন ওকে আর গুরুপত্নীকে নিয়ে বসেছেন।

ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমের ভাপওড়া সকাল ছিল সেটা।

আগের ক’দিন বাড়ি ছিলেন না গুরুজী। ওষুধ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। দুদিনের জন্য। কিন্তু দেরি হচ্ছিল ফিরতে। গুরুপত্নী বলেছিলেন ওষুধ খুঁজতে তো না, গুরু যায় তার আরেক বউর কাছে। সেই বউ আসতে দিচ্ছে না তাই দেরি হচ্ছে। অমন অবশ্য প্রায়ই হতো। পায়ই সপ্তা দুসপ্তা বাড়ি থাকত না গুরুজী।

একা থাকতে ভয় করে গুরুপত্নীর। ঘুম আসে না। মাঝরাত পর্যন্ত তাই পাহারা দিতে হয়। গল্প বলতে হয়। গান গাইতে হয়। ঘুমুলে তবেই ছুটি। রাতের শেষাংশটুকু নিজের ছাপড়ায়ই কাটাত ছেদু।

দুপুর নাগাদ রওনা হয়েছিল গুরুজি। বেশি দূরের পথ না। সন্ধ্যা উৎরোলে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু পথে এক রোগীর সন্ধান পেয়ে থামতে হয়েছিল তাকে। ফিরতে তাই রাত। তবে তখনো ছুটি হয়নি ছেদুর। দরজা খুলতে তাই দেরি হয়েছিল গুরুপত্নীর। গুরুজীর পায়ের ধুলো নিতে গিয়েই ছেদু বুঝে নিয়েছিল যা বোঝার। কিন্তু যেটা ভাবতে পারেনি, সেটাই ঘটেছিল পরসকালে।

লাল টকটকে চোখে তাকিয়ে ছিলেন গুরু ওর দিকে। পাশেই বসা গুরুপত্নী। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছিলেন। কেঁপে কেঁপে উঠছিলেন।

গুরুজীর স্বর কিন্তু অস্বাভাবিকরকম স্বাভাবিক ছিল! অবাক লাগছিল শুনতে।

এটা সেটা ওটা নিয়ে নাড়তে নাড়তে শেষে প্রশ্নটা করেছিলেন গুরু। ‘তোর এ্যটটা সুযুগ দোবা হইলো, এ্যটটা রোগীকে সারাইত পারবি না নলি রোগডা নির্মূল করতি পারবি। এ্যটটা কোরলি আরেটটা কোরা যাবে না। কোইনডা করবি?’ বলেছিলেন উত্তরের উপরই নির্ভর করছে ছেদুর আর গুরুপত্নীর ভাগ্য। উত্তর দেয়াটা সহজ তাই ছিল না সেদিন। বুঝে উঠতে পারছিল না কী উত্তরে কী শাস্তি। শাস্তিটাই বা কার। নাকি দুজনেরই। দরদর করে ঘামছিল ছেদু- এখন যেমন ঘামছে আব্বাস রাজাকার। তার চোখের দিকে তাকিয়ে দুনিয়ার খিস্তি উজাড় করে দিচ্ছে ছেদু। সাপের মা বাপ চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে সে। আর মনে মনে হাসছে। সাপের বিষ যদি সত্যিই থাকত, এই গাল শুনেই ঝরে যেত গা বেয়ে! যেমন করে ওর সমস্ত সাহস আর বুদ্ধি সেদিন ঝরে পড়ছিল ঘামের স্রােতে।

সামনে লাল-চোখ মাতাল গুরুজি আর পাশে কাঁপতে থাকা গুরুপত্নির চেহারা মনে পড়ল আবার। ঠিক করে উঠতে পারছিল না কী করবে। রোগটাকে নির্মূল করলে রোগীটা বাঁচে না। কারণ আগে থেকেই আক্রান্ত সে। আবার রোগীকে বাঁচাতে গেলে রোগ বেঁচে যায়, পরে নানাজনের মরার আশংকা। সময় হয়ে আসছিল। উত্তর একটা দিতেই হতো। তাই ছুড়ে দিয়েছিল ঢিল একটা অন্ধকারে। শুনেই থমকে গিয়েছিল গুরুজী। পাথুরে স্বরে বলেছিল, ‘মিলা শিষ্যুকে শিখুইচি, তোর মতো ধুরুন্ধুর আর এ্যটটাও দেকিনি।’ তারপর বের করে দিয়েছিল। আর যেন ছেদুর মুখ দেখতে না হয় তার।

কী করবে কী করবে না বুঝতে পারছিল না ছেদু। সংশয় আর বিষ্ময়ে ডুবে থাকা ভারী পাদুটো বাড়িয়েছিল ধীর পায়ে। কিছুক্ষণ পরই চিৎকার শুনেছিল একটা। পেছন ফিরে দেখে পড়ে আছে গুরুপত্নী। ফিনকি ছুটছে গলা দিয়ে।

কী নৃশংস! চোখ বুজে আসে ভয়ে। এখনো।

চোখ বুজেই থাকল কিছুক্ষণ। তারপর যখন খুলল, চোখদুটো তখন লোহিত সাগর! গুরুজিই যেন তাকিয়ে আছে ওর চোখের ভেতর দিয়ে। লাল টগবগে আগুনরাঙা চোখ তখন আব্বাস রাজাকারের দিকে। মুখভরা আদিরসাত্মক খিস্তিখেউড়।

ছেদু ভালো করেই জানে, সেদিন সে ভুল বলেছিল। আসলে একজন রোগীকে সারানোর চেয়ে রোগটাকে মেরে দেয়াই কাজের।

সাপের বিষ নামানোর কোনো ওষুধ ওকে শেখায়নি গুরুজী। তার আগেই শেষ হয়ে গেছে ছাত্রজীবন। তবে মানুষ মারার ওষুধ ও ঠিকই শিখেছিল। কিন্তু সমস্যা হলো ওষুধটাতে মরণ হয় আরামে। আরামের মরণ সবার জন্য না।

আরামের হোক, বা ব্যারামের, মরণের কথা উঠছে কেন?

মৃত্যু তো ঘুমেরই মতো। ঘুম তো মৃত্যুরই মহড়া। সময় হলে আসে। সারাবেলা জ্বালিয়ে রাখা স্বার্থের আলো নিভিয়ে মানুষ শুয়ে পড়ে, আশা পরে আবার উঠবে, কিন্তু ওঠে না। সারাজীবন অন্যায় অত্যাচার করেছে, সুখে থেকেছে, মরার সময় মরল, সে তো ভালো মানুষও মরে- এ আর এমন কী! শাস্তি হিসেবে মৃত্যু তাই হালকাই শুধু না, অন্যায্যও। শাস্তি হতে হলে তাকে শাস্তিই হতে হবে, মৃত্যু না। হতে হবে এমন কিছু ভোগ করতে হবে। যাতে সে বাঁচবে কিন্তু বাঁচবে না! মরবে কিন্তু মরবেও না!

ভাবতে থাকে ছেদু। ভাবতেই থাকে। একেকটা সিদ্ধান্ত নেয়, আর বাতিল করে। সুতোয় বাঁধা চরকির মতো ঘুরতে থাকে মন। স্থির হয় না। কিন্তু চিকিৎসা তো করতে হবে! আব্বাসের অণ্ডকোষের বাঁধনটা তাই এঁটে দেয় আরেকটু। চলতে থাকে খিস্তিখেউড় আর মন্ত্র পড়া। চলতে থাকে অভিনয়।

সূর্যের চুল্লিতে কেউ বোধহয় ঘি ঢেলেছে। খাঁটি গাওয়া ঘি! রোদটা তাই চড়ে যাচ্ছে। চড়েই যাচ্ছে। ভালোই হলো। বিষ পোড়াতে এমন নরকাগ্নিই তো লাগে। তাছাড়া আব্বাস মুসলমান, মুখাগ্নি হবে না, বেঁচে থাকতেই হয়ে যাচ্ছে!

ঠোঁটের কোনায় হাসি লুকিয়ে চোখের কোনা দিয়ে তাকায় ছেদু। তখনই কেমন ঘুরে ওঠে মাথাটা। পড়ে যায় ও। কী হলো। পুরোনো মৃগী রোগটা কি ফিরে এল আবার? তাহলে তো দাঁত লেগে যাবে এখন। কাঁপতে থাকবে চালু হওয়া শ্যালোমেশিনের মতো। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। ক’দিনের না-খাওয়া দেহ, টানা রোদের ধকল নিতে পারেনি। স্বস্তিটা বোধ হয়েছে কি হয়নি, অমনি একটা লাথি খেল মাথায়। অন্ধকার হয়ে গেল চোখজোড়া। মুখের উপর আগুনপারা রোদ। কে মেরেছে দেখা গেল না তাই। তবে তার গলা শোনা গেল। ‘খবরদার, কোনো চালাকি করবি না, মালাউনের বাচ্চা। হুজুরির কিচু হলি, তোরে জ্যান্ত পুড়ায়ে ফ্যালব।’

দম আটকে আসে ছেদুর। দাঁড়াতে চেষ্টা করে সে। টলে পড়ে যায় আবার। অসহায় চোখে তাকায়। চারপাশে রাজাকারের দল। একটা হাত এগিয়ে আসে তাকে তোলার জন্য। কিন্তু ছেদু ঠিক করতে পারে না, রাজাকারের হাত ধরে ওঠাটা ঠিক হবে কি না।

এ জাতীয় আরো খবর